July 30, 2021, 12:50 pm

creativesoftbd.com
শিরোনামঃ

কালজয়ী শিক্ষক নিয়ে গল্প লিখলেন এডিশনাল ডিআইজি মনিরুজ্জামান     

লেখক: এডিশনাল ডিআইজি মনিরুজ্জামান।

আজকের খবর ডেস্ক:  করোনার তান্ডবে অফিস আদালত সব বন্ধ। তারপরেও উইক ডে তে আমরা নিয়মিত অফিস করি। উইক এন্ডে এবং অফিস আওয়ারের পর ওয়ার্ক ফ্রম হোমতো আছেই। শুক্র, শনিবার অফিস যেতে হচ্ছেনা। ঘুমিয়ে, টিভি দেখে, রান্না করে শুক্র, শনিবারটা ভালই গেল। অনেক রাত অবধি সিনেমা দেখলাম। রাত দুইটায় ঘুমালেও অভ্যাস বসে সেই ভোরেই ঘুম ভাঙ্গল। নামাজ পড়ে আবার ঘুমোলাম। উঠে দেখি ০৮টা বাজে। বাসার সবাই গভীর ঘুমে। রাত জেগে সিনেমা দেখা এবং সকালে কারোর কিছু করার নেই ভেবে সবাই নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোচ্ছে। তা ঘুমুক একটু। এই ব্যস্ত শহরে করোনার কল্যাণে এটুকু বিশ্রাম একটু উপভোগ করুক এই দুর্বিপাকের মধ্যে। কি করব না করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে বসে গেলাম। আরও ঘন্টাখানেক বাসা সুনসান থাকবে।

আমি লেখক নই তবে খাতা কলম নিয়ে মাঝে মাঝে বসতে ভাল লাগে। কি নিয়ে লিখব নিজের হাতে বানানো এক কাপ ব্লাক কফি খেতে খেতে ভাবছিলাম। মনে পড়ল স্যারদের কথা। দুটো প্রাইমারী স্কুল, দুটো হাইস্কুল, একটি কলেজ, ০২টি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান আমার ৭টি। প্রায় সব স্যারদের কথাই আমার মনে আছে, এর মধ্যে কোন কোন স্যার স্থায়ীভাবে মনে দাগ কেটে গেছেন। ছাত্র হিসাবে আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি জীবনে কিছু নিবেদিত প্রান শিক্ষকের সাহচর্য্য আমি পেয়েছি এজন্য।

এমনি একজন স্যারকে নিয়ে আজ ভাবতে শুরু করলাম। স্যারের নাম জনাব মোঃ আবু জাফর, অবসর প্রাপ্ত সিনিঃ শিক্ষক বুরুজবাগান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শার্শা, যশোর।

আমি প্রাইমারি স্কুল পাশ করি আমার আব্বার স্কুল(আব্বা ২০/২৫ বছর ধরে এ স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন,এলাকাবাসী স্কুলটিকে কবির স্যারের স্কুল বলেই জানতো) অর্থ্যাৎ নাভারন রেল বাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। ট্যালেন্ট পুলে ১ম হয়ে বৃত্তি পেয়েছিলাম বলে উপজেলার লিডিং স্কুল গুলোর সবকটিই আমাকেসহ বৃত্তি প্রাপ্ত ছাত্র ছাত্রীদেরকে তাদের স্কুলে ভর্তি করাতে চেষ্টা করে। পারলে নিজেদেরকে সফল এবং না পারলে ব্যর্থ মনে করে। বিশেষ করে উপজেলার যে অঞ্চল হতে ছেলে বা মেয়েটি বৃত্তি পেয়েছে ঐ অঞ্চলের হাইস্কুল গুলো বৃত্তি প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নিজেদের স্কুলে নিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালায়। এটি হয়ে থাকত নিয়মিতই।

শার্শা উপজেলার মোটামুটি ০৪ টি বড় জনপদ নাভারন, শার্শা, বেনাপোল এবং বাঁগআচড়া। এর মধ্যে নাভারন এবং শার্শার দূরত্ব মাত্র ৩ কিঃ মিঃ। একটি উপজেলা হেডকোয়ার্টার্স আরেকটি উপজেলার প্রাচীন প্রসিদ্ধ জনপদ। শার্শা পাইলট হাইস্কুল এবং বুরুজবাগান মাধ্যমিক বিদ্যালয় উপজেলার দুটি স্বনামধন্য হাইস্কুল। দীর্ঘ দিন ধরেই উপজেলার সেরা এই দুই মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্ধন্দিতা ছিল।

বুরুজবাগান হাইস্কুল সেই বৃটিশ পিরিয়ডে স্থাপিত প্রাচীনতম এবং ঐতিহ্যবাহী স্কুল। পক্ষান্তরে শার্শা পাইলট হাইস্কুল অপেক্ষাকৃত নবীন হলেও উপজেলা হেডকোয়ার্টার্স হওয়ার কারনেই হোক বা এর তৎকালীন কর্মবীর প্রধান শিক্ষক জনাব মনোয়ার হোসেন স্যারের প্রানান্ত প্রচেষ্টাতেই হোক উপজেলার অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে পরিনত হয়েছিল। ক্লাস এইটে এখান থেকেই সবচেয়ে বেশী বৃত্তি পেত এবং এসএসসিতে আশির দশকে পরপর কয়েকবার সবচেয়ে বেশী ১ম বিভাগ, স্টার মার্কস এবং সেন্টার ফাস্ট ও হয়েছে এ স্কুল থেকেই।

ব্যক্তিগতভাবে শার্শা স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক জনাব মনোয়ার হোসেন স্যার ছিলেন আমার আব্বার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি আমার আব্বার জীবদ্দশায় যে কজন লোককে আমার আব্বাকে নাম ধরে ডাকতে শুনেছি মনোয়ার স্যার তার অন্যতম। বুরুজবাগান স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব মোঃ শফিউর রহমান স্যারকে আমার আব্বাও মুরুব্বি মানতেন। গভীর সম্মান করতেন।

প্রাইমারী স্কুলে আমি নাভারন এলাকার ছাত্র কাজেই নাভারনের হাইস্কুলেই আমার ভর্তি হওয়া উচিত শফি স্যারের এ যুক্তি হয়তো বা আব্বার সাথে শার্শা স্কুলের হেড স্যারের বন্ধুত্বের কাছে হার মানল। আমি গিয়ে ভর্তি হলাম শার্শা পাইলট স্কুলে। একা নই, আমার সাথে ফাইভে বৃত্তি পাওয়া নাভারনের আরো কয়েকজন সাথী হল।

বুরুজবাগান হাইস্কুলে ভর্তি না হওয়ার অন্যান্য অনেক কারনের সাথে আরেকটা যৌক্তিক কারন ছিল সাইন্সের শিক্ষকের ঘাটতি। যে জন্য এত কথা বললাম সে প্রসংগে আসি। জাফর স্যার বুরুজবাগান হাইস্কুলে যোগদানের আগ পর্য্যন্ত বিজ্ঞান শিক্ষকের একটি দৃশ্যমান ঘাটতি ছিল স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদের উপর যথাযথ সম্মান রেখেই একথা বলছি।

মফস্বলের স্কুলগুলোতে এসএসসির রেজাল্ট বা বৃত্তির রেজাল্ট নির্ভর করত এক দুজন নিবেদিত প্রান শিক্ষকের প্রানান্ত প্রচেষ্টার উপর। বুরুজবাগান স্কুলের এরকম প্রানভোমরা ছিলেন জাফর স্যার-কুদ্দুস স্যার জুটি, পরবর্তীতে তাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন শাহাবুদ্দিন স্যার। হেড স্যার সহ অন্যান্য শিক্ষকদের দৃশ্যমান তৎপরতা তো ছিলই। সাথে নাজিম স্যার,সালাম স্যার, নিখিল স্যাররাও ছিলেন সারথী।

জাফর স্যার আব্বার সরাসরি ছাত্র না হলেও আব্বাকে নিজের শিক্ষকরূপে সম্মান করতেন। জাফর স্যার সহ নাভারন এলাকার শিক্ষকদের আড্ডারস্থল ছিল আব্বার স্কুল অর্থ্যাৎ নাভারন রেল বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রায়ই এখানে উপজেলার তারকা শিক্ষকদের মেলা বসত। আমাদের কাজ ছিল চা বিস্কুট বা ওযুর পানি এগিয়ে দেয়া, পরম শ্রদ্ধাও তৃপ্তি নিয়েই সে কাজটা করতাম আমরা।

জাফর স্যারের অনুরোধেই মাত্র এক বৎসর পর অর্থাৎ ক্লাস সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষার আগেই আমিসহ আমরা আরো কয়েকজন শার্শা থেকে বুরুজবাগান স্কুলে এসে ভর্তি হই। এক বছর পরেই বৃত্তি পরীক্ষা। সে বছরই আমাদের স্কুলে এসে জয়েন করেন আরেকজন তরুন শিক্ষক, শাহাবুদ্দিন স্যার। হেড স্যার জনাব শফি স্যার পড়াতেন ইংরেজি, জাফর স্যার, শাহাবুদ্দিন স্যার মিলে অংক-বিজ্ঞান, কুদ্দুস স্যার বলতে গেলে বাকী সব।

ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রথম ২০ জনকে মনোনীত করে তাদেরকে ছয় মাস স্কুলের তত্ত¡াবধানে নেওয়া হতে থাকে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। আব্বার পরামর্শে স্কুল কর্তৃপক্ষ বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের খাওয়ার ব্যবস্থাটি করেন এভাবে যে, স্কুলের পার্শ্ববর্তী বাড়ী এমন একটি ছেলের সাথে দূরবর্তী বাড়ী একটি ছেলের জোড় হবে। দুপুরের দুজনের খাবারই আসবে দূরবর্তী ছেলেটির বাড়ী থেকে আর রাতের খাবার আসবে স্কুল নিকটবর্তী ছেলেটির বাড়ী থেকে। সকালেরটা যার যার।

স্কুলের দুটি কক্ষে আমরা ঘুমাতাম ফ্লোরে বিছানা করে। এমনকি মূলত শীতকালের পুরোটাই আমরা স্কুলে ফ্লোরিং করেছি, খুব একটা ঠান্ডা যে লাগত এমন তো মনে হয়না। কত যে স্মৃতি, মজার দুষ্টুমির এগুলো বলে শেষ করা যাবেনা।

খুব ভদ্রভাবে একটা বলি, কেউ কিছু মনে করবেন না এই শর্তে। স্কুলে বাথরুম ছিল বিল্ডিং এর বাইরে। নীচ তলায় সিঁড়ির গোড়ায় ও একটা ছিল। আমরা মূলত সেটিই ব্যবহার করতাম। বৃষ্টির দিনে আমাদের একটা মজার খেলা ছিল। Urine Discharge Compettion.

বৃত্তি পরীক্ষা দিব কাজেই রাত জেগে পড়তাম। আর বন্ধুরা মিলে নানা রকম মজা করতাম। বিশাল বড় দুইতলা স্কুল বিল্ডিং এর শেষ প্রান্তের একটি রুমে আমাদের দেখাশোনার জন্য শাহাবুদ্দিন স্যার থাকতেন। স্যার একটু ঘুমকাতুরে ছিলেন। ১১টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তেন। আমাদের জন্যও সে নির্দেশনাই ছিল। কিন্তু আমরা প্রায়ই সেটা মানতাম না।

বৃষ্টি হলে ৫/৭ ফুট ব্যবধানে একেক জন দাঁড়িয়ে যেতাম। কম্পিটিশানটা ছিল কার ইউনিয়ন কত দূরে গিয়ে পড়ে। বেশীর ভাগ রাতেই সে খেলার ফলাফল অমিমাংসিত থাকতো, কারন সে খেলায় প্রত্যেকেই ছিল খেলোয়াড়, কোন রেফারি ছিল না, কাজেই সবাই দাবী করত তার টাই বেশী দূরে গিয়ে পড়েছে। বেশী চিৎকার করে নিজের দাবীও প্রতিষ্টা করা যেতনা, কারন এক, সিঁড়ির গোড়ায় দোতলায় একটা মাত্র বড় আলোতে পরিস্কার বোঝা যেতনা। কারন দুই, বেশী চিৎকার করলে শাহাবুদ্দিন স্যারের ঘুম ভেঙে মার খাওয়ার ভয় ছিল। এমনিতেই স্যারকে আমরা খুব ভয় করতাম। স্যার তখন সদ্য বিবাহিত। সম্ভবতঃ জুনিয়র মোস্ট শিক্ষক বলেই হয়তো সবাই মিলে স্যারকে এই কন্টিনিউ নাইট ডিউটি দিয়েছেন। স্যার সুযোগ পেলেই মার দিতেন। এখন বুঝি তা কত কাজের ছিল।

উপজেলার মধ্যে আমাদের স্কুল সবচেয়ে বেশী বৃত্তি পেল। যে কথাটি বলা হয়নি সেটি হল এই যে স্পেশাল ক্লাশ, স্কুলে থাকার ব্যবস্থা, এমনকি রাত্রিকালে শিক্ষকদের তত্ত¡াবধানে পড়াশোনা এগুলো সবই ছিল বলতে গেলে ফ্রি। যতটুকু মনে পড়ে আমরা ৫০ টাকা করে মাসে দিতাম। তার মধ্যে আছে অপেক্ষাকৃত অস্বচ্ছলদের মাফ, ফাস্ট এবং সেকেন্ড বয়কে সম্মান করে টাকা না নেওয়া ইত্যাদি। এই পরিনত বয়সে এসে যখন এগুলো ভাবি শ্রদ্ধায় শির নত হয়ে আসে।

রাতে সাধারনতঃ আমাদের কোন সুনির্দিষ্ট ক্লাশ থাকতোনা, শাহাবুদ্দিন স্যারের তত্ত¡াবধানে আমরা নিজেরা পড়তাম। কিন্তু প্রায়ই হেডস্যার এসে হঠাৎ ইংরেজি ধরতেন, জাফর স্যার এসে হঠাৎ পরীক্ষা নিতেন আর কুদ্দুস স্যারের বাড়ী তো স্কুলের পাশেই। উনি এমনকি রাতে শোবার আগেও মাঝে মাঝে এসে দেখে যেতেন আমরা কি করি না করি। শাসন ছিল, ভয় ছিল কিন্তু আদর আর ভালবাসা ছিল সবচেয়ে বেশী। যত ভাবি ততই শ্রদ্ধা আসে, নিজেদের কে অপরাধী মনে হয়। স্যারদের ভালবাসার প্রতিদান তো আমরা দিতে পারিনি চেষ্টাও বা কতটুকু করেছি?

বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হল। জাফর স্যারের সাথে মূলত ইন্টারএকশানটা নাইনে উঠেই হল। পরিবারের সবাই চাইতো আমি সায়েন্স পড়ি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিছু একটা হই। ছোট চাচা তখন ডাক্তার, মামাও ভর্তি হয়েছে মেডিকেলে। আমি ক্লাসের ফাস্ট ‘বয়’, তাদের পদাঙ্ক অনুসরন করব এটাই স্বাভাবিক। আমি বেঁকে বসলাম। কেন যেন ঐ বয়সে আমার মনে হয়েছিল সাহিত্য বা সমাজ তত্ব আমাকে যতটা টানে অংক বা বিজ্ঞান আমাকে ততটা টানেনা। এর কারনও ছিল। পরীক্ষায় দেখা যেত আমার সাথে যার কম্পিটিশন অংক এবং বিজ্ঞান ব্যতীত অন্যান্য ৭/৮ বিষয়ে হয়তো আমি তারচেয়ে বেশী পেয়েছি। কিন্তু অংক বা বিজ্ঞানে সে ওটা পুষিয়ে নিয়েছে বা কাছাকাছি গিয়েছে। এজন্য মনে হল মানবিকে পড়াই আমার জন্য ভাল হবে।

যাহোক পৌরনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস পড়া শুরু করলাম। আব্বা সন্তুষ্ট না হলেও বুঝতে দেননি। ক্লাস নাইনের ১ম সাময়িক পরীক্ষার ঠিক আগে গ্রুপ নির্ধারনের সময় এলো। জাফর স্যার আমাকে নিয়ে বসলেন। বুঝালেন বিজ্ঞানের রহস্য, কেন বিজ্ঞান পড়তে হবে। বিজ্ঞানের শিক্ষকতার পাশাপাশি জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, ধর্ম তত্ব, বিশেষ করে জ্যোতি বিজ্ঞান ব্যাখ্যার ধারনা আমি স্যারের কাছ থেকেই ঐ বয়সে মন্রমুগ্ধের মত শুনতাম। ক্রমশঃ স্যারের ভক্ত হয়ে পড়লাম। স্যার তখনো অবিবাহিত। কাঁচা চাপ দাড়িতে দারুন সুদর্শন। ছাত্রীদের কাছে তো বটেই, ছাত্রদের কাছেও হিরো। উদাসীন টাইপের ছিলেন। পাজামা পাঞ্জাবী পরা চিন্তা চেতনায় অত্যাধুনিক মানুষ। রেডিওতে টেস্ট ক্রিকেট পর্য্যন্ত শুনতেন। কোরান, হাদীস, বিজ্ঞান, রাজনীতিতে ভাল দখল ছিল। চন্দ্র ও সূর্যের অবস্থান, শুকতারা থেকে নিহারিকার বিষয়ে অনর্গল কোটেশন দিতেন। গ্যালাক্সি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে স্যারের উজ্জল চোখগুলো আনন্দে চকচক করত।

স্যার আমাকে বুঝালেন কেন বিজ্ঞান পড়তে হবে। বুঝাতে গিয়ে উনি একবারেও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞান পড়ার পার্থিব লাভ ক্ষতি এগুলো বলেননি। বলেছেন একজন আধুনিক মানুষ সে যদি ইতিহাসের অধ্যাপকও হয় কেন তার বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া উচিত। স্যারের ব্রিফিং মেনে নিলাম। ১ম সাময়িক পরীক্ষা মানবিক বিভাগ থেকে দিয়ে পরে নাম লিখালাম বিজ্ঞানের খেরোখাতায়।

আমার বন্ধু ডাঃ আলাউদ্দিন, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। ওর আর আমার জায়গা হল স্যারের বাড়ীর পার্শ্বে কৃষি বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কক্ষে। পড়াশুনার সুবিধার জন্য। এক রুমের ছোট ডরমিটরী।
সিঙ্গেল খাটে ‘দু’ বন্ধুর নতুন জীবন। এক বৃদ্ধা মহিলা ছিলেন নাম ওলির মা, আমাদের রান্না করে দিতেন। প্রায়ই অসুস্থ্যতার কারনে তিনি আসতেননা। সেখান থেকেই আমার রান্নারও হাতেখড়ি। রান্না বলতে কেরোসিনের স্টোভে চাল, ডাল, আলু, ডিম, পিয়াজ, নুন তেল একসাথে দিয়ে অদ্ভূত এক খিঁচুড়ি। খেতে মন্দ হতনা। স্টোভ ধরানোই ছিল কঠিন কাজ। আলু আর পেয়াজ কাটাও সহজ ছিল না। আলু কাটতে গিয়ে দা বটি পিছলে যেত, আমার সবগুলো আঙ্গুলই প্রায় ক্ষত-বিক্ষত ছিল আলু কাটতে গিয়ে। পিঁয়াজ কাটতে গিয়ে রক্ত না ঝরলেও চোখের পানি ঝরেছে বিস্তর।

আলাউদ্দিন ছিল সব কিছুতেই নির্বিকার। খাবার আছে বা নাই এসব নিয়ে তার মাথাব্যাথা নেই। না খেয়ে শুয়ে থাকতে পারতো, আমার ঠিক উল্টো, ক্ষুধা লাগলে দুনিয়া আন্ধার। আসেপাশে কোন হোটেলও ছিলনা। অগত্যা জাতি পেল এক কিশোর রাধুনী।

পাশেই নাভারন ইউনিয়ন পরিষদ। তার নীচতলায় দিশারী ক্লাব। স্যার সে ক্লাবেরও সভাপতি। সন্ধ্যা হলেই ব্রিজ খেলা শুরু হত বড়দের, যথারীতি স্যার এক গ্রুপের মধ্যমনি, বিকাল বেলায় ছেলেরা ফুটবল, ভলিবল খেলতো। রাত ১০ টার দিকে স্যার ব্রিজ, ক্লাবের পাট চুকিয়ে আমাদের রুমে আসতেন। আমরা সারা দিনের সমস্যাগুলো জমিয়ে রাখতাম, স্যার বুঝিয়ে দিতেন। তা সে বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান বা অংক যাই হোকনা কেন।

এরপর আমরা দুজনে স্যারকে স্যারের বাড়ী পর্য্যন্ত এগিয়ে দিতাম। যাওয়ার পথে আকাশ মেঘলা বা তারায় ভরা যাই হোকনা কেন চেষ্টা করতাম কোনভাবে স্যারের চোখ একবার আকাশের দিকে ফেরানোর বা ও প্রসংগে আসার। একবার শুরু হলে এক কিলোমিটার পথ নিমিষেই শেষ হত। স্কুল শেষে স্যার এসএসসি পরীক্ষা একটা বড় ব্যাচ গ্রæপে পড়াতেন। বিভিন্ন স্কুলের সেরা ছাত্র/ছাত্রীরা থাকত। স্যার শিক্ষক হলেও একটা বড় অংশ আমিই পড়াতাম আমার বন্ধুদেরকে। বিশেষ করে টেষ্ট পেপার সল্ভ। বলতে গেলে সেটিই ছিল আমার প্রাকটিস। আমার নিজেরও প্রাকটিস হয়ে যেত, বন্ধুদের এমনকি স্যারেরও সহায়তা হত।

টেষ্ট পরীক্ষার পর স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। স্যারের পুরোটা জুড়ে তখন আমরা। বিজ্ঞানের শিক্ষক তিনি আমাদেরকে শেখাতেন ভূগোলেও কিভাবে ভাল নাম্বার পাওয়া যাবে। কিভাবে ছক বানাতে হবে, লেখার ধরনটা কেমন হবে এসব। অংকে আমার মাঝে মাঝেই অযৌক্তিক টাইপের ভুল হত। যোগ বিয়োগ বা গুন ভাগের। স্যার বার বার স্মরন করাতেন।

প্রায়ই মোগল সাম্রাজ্য, ইসলামের ইতিহাস, ক্রুসেড, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের কাহিনী শুনাতেন। উনার প্ররোচনাতেই আমার জগত, জীবন সংশ্লিষ্ট এমনকি রাজনৈতিক উপন্যাসের হাতে খড়ি। ‘‘আমি সুভাষ বলছি’’, ‘‘কালবেলা’’, ‘‘কালপুরুষ’’, ‘‘পূর্ব পশ্চিম’’, ‘‘মোগল হেরেমের অন্তরালে’’, ‘‘ভারত যখন স্বাধীন হচ্ছিল’’ এসব নাম স্যারের কাছ থেকেই প্রথম শুনেছি। সেই যে নাইন টেনে শুরু করেছি আজো ছাড়তে পারিনি।

স্যার অনেক কিছু শিখিয়েছেন, খালি পড়াশোনা নয় একটা আধুনিক মানুষের বেড়ে ওঠার জন্য কৈশোরে যে চেতনা দরকার স্যার আমাকে তা দিয়েছেন বা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

স্যার সম্পন্ন পরিবারের সন্তান, কিন্তু কিছুটা সংসার বিবাগী। সারা জীবন পরের ছেলে মেয়ে নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন এমনকি নিজের সন্তান হওয়ার পরেও। আমাদের স্কুলের এক বড় ভাইসহ আমাদের এলাকার দরিদ্র পরিবারের কৃতী ছাত্রদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। পরামর্শের পাশাপাশি নিয়মিত আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন। অনেককে নিজের বাড়ীতে রেখে পড়াশুনা করিয়েছেন। সেই সব বড় ভাইদের সাথে স্যারের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এমনকি তারা যখন স্কুল কলেজ পেরিয়ে বুয়েট মেডিকেল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখনো প্রাক্তন ছাত্ররা প্রায়ই স্যারকে চিঠি লিখতেন। স্যার আমাকে পড়তে দিতেন কখনো কখনো। ঝকঝকে হাতের লেখায় স্যারের প্রতি অদম্য মেধাবীদের শ্রদ্ধাবোধ পড়ে মোহিত হতাম। তাদের মত হবার স্বপ্ন দেখতাম।

স্যার ভাল বক্তা, ভাল সংগঠক ছিলেন। অবসরে গিয়েও নিজের বাড়ীর পাশে তার হাতে গড়া দিশারী স্কুল পরিচালনা করছেন। স্বাভাবিক ভাবেই সেখানকার রেজাল্ট ঈর্ষনীয়। না হওয়ার তো কথাও নয়।
ভাবীও স্যারের যোগ্য সাথী। একই রকম। তাদের ঘর আলোকিত করে এসেছে তিন সন্তান। বড় মেয়ে ডাক্তার, ছোট মেয়ে ফার্মেসীর শেষবর্ষ এবং একমাত্র ছেলে ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে খাদ্য ও পুষ্টির মেধাবী ছাত্র। দেশজুড়ে আছে স্যারের হাজার হাজার মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। আর বর্তমানে ব্যস্ত থাকেন দিশারী স্কুলের কচি কাঁচাদের নিয়ে।

সেই উননব্বই তে স্যারের ছাত্র ছিলাম কিন্তু এখনো মনে হয় কত কিছু শিখি। যোগাযোগ কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়নি। স্যার আমাকে আমার মত অনেককে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। এখনো দেখিয়ে যাচ্ছেন। নিজের বাড়ীর পার্শ্বে নিয়ে এসে বলতে গেলে অভিভাবকত্ব করেছেন। কোন দিন একটা টাকা দিইনি বা নেননি। আব্বা অনেকবার চেষ্টা করেছেন। স্যার হাসতেন শুধু।

এখনো একটু সময় পেলে যখন ভাবি তখন মনে হয় জীবনে এসব শিক্ষকদের ছোয়া, সান্নিধ্য পেয়েছি বলেই বোধ হয় যৎসামান্য যে ভাল কাজগুলো করি তার অনুপ্রেরনা পাই। ২০১৮ তে স্যারের সাথে একসাথে হজ্ব করলাম। স্যারকে যতবারই দেখতে গেছি ভীষন খুশী হয়েছেন। কাছে গিয়ে যখন বসি স্যার তার কৃতি ছাত্র ছাত্রীদের কথা বলতে থাকেন, স্যারের উজ্জল চোখ দুটো আবার বেশী ঝকঝক করতে থাকে।

পরের সন্তানের সাফল্যে এমনভাবে খুশী হতে পারেন বলেই হয়তো বা তিনি কালজয়ী শিক্ষক। রাব্বুল আলামিন স্যারকে, স্যারের পরিবারকে ভাল রাখুন। ইহকালে শান্তি আর পরকালে উত্তম প্রতিদান দিক, স্নেহধন্য সন্তানতুল্য ছাত্র হিসাবে এ প্রার্থনা করি।

creativesoftbd.com

     আজকের খবর বিডি কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  

জরুরি সেবা ফোন নাম্বার