June 22, 2021, 2:48 pm

creativesoftbd.com

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ড.আসিফ নজরুলের বিশ্লেষণ

ঢাকাঃ- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, সরকারের অন্যায়ের সমালোচকদের আর বিরোধী মতের কণ্ঠ রোধ করার জন্য করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এর মাধ্যমে বিরোধীদের হয়রানি আর আতঙ্কে রাখাই তাদের উদ্দেশ্য।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কাজেও ব্যবহার হতে পারে এ আইন। এ আইন থাকলে গণতন্ত্র, স্বাধীন মত প্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সবই বিপন্ন হবে।

প্রফেসর আসিফ নজরুল বলেন, সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ বেশ কিছু ঘটনায় মানুষের যে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে তাতে সরকারের মনে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। এসব আন্দোলন দ্রুত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ভূমিকা পালন করেছে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তাই এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ব্যবহার করতে পারবে সরকার। আর সে কারণেই সরকার চায় এ ধরনের আইন থাকুক।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ৫৭ ধারার অপব্যবহারে মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সেজন্য আগামীতেও সরকারের সব সমালোচনা বন্ধ এবং ভিন্ন মত দমনে সরকারের হাতে এ ধরনের আইন থাকা এবং এর অপপ্রয়োগ খুবই কাজে দেবে। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশের হাতে যে অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাতে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে শুধু সমালোচনা বন্ধ নয় বরং বিরোধীদের দমনে সরকার পুলিশকেও ব্যবহার করতে পারবে। এ আইন বিরোধী রাজনীতিকদের মনেও আতঙ্ক সৃষ্টি করবে।

এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, সরকার অনেক আশ্বাস দিলো ৫৭ ধারা থাকবে না। কিন্তু এখন দেখা গেল এটি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ৫৭ ধারাকে আরো শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে নতুন আইনে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারাকে সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ধারায় ভাগ করে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে এটি পরিষ্কার যে, সরকার তার সব সমালোচক আর ভিন্ন মত পোষণকারীদের আতঙ্কে রেখে দেশকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে চায়।

আসিফ নজরুল বলেন, এ আইন কার্যকর হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বলতে আর কিছু থাকবে না। সরকারি কোনো অফিস থেকে কেউ কি সাংবাদিককে বলবে আসেন আমার অফিসে এই এই দুর্নীতি হয় এবং এরপর কি একজন সাংবাদিক রিপোর্ট করবেন? এটি তো হাস্যকর। এভাবে সাংবাদিকতা করতে হলে তো ব্যাংকের লুটপাট, আর সোনার মেডেলের জালিয়াতির যে রিপোর্ট হয়েছে তা করা সম্ভব হতো না এবং তাদের জেল হওয়ার কথা এ আইন অনুযায়ী।

তিনি বলেন, নতুন আইনটির ৩২ ধারায় ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অফিসিয়াল সিক্রেটেস অ্যাক্টের অধীনে অপরাধগুলো করলে শাস্তির বিধান করা হয়েছে। অফিসিয়াল সিক্রেটেস অ্যাক্টের বিভিন্ন ধারা অনুসারে যেকোনো সরকারি অফিসকে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আওতায় আনা যায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনকি অফিসিয়াল সিক্রেটেস অ্যাক্টের চেয়েও কঠোর।

আসিফ নজরুল বলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এখনই এ আইন ঠেকাতে না পারলে আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন গণমাধ্যমের পথ চলা বন্ধ হয়ে যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র।

আরো পড়ুন : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যেসব ঝুঁকিবিবিসি বাংলা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮বাংলাদেশে ২০১৩ সালে আইসিটি আইনে ৫৭ ধারা যুক্ত হওয়ার পর গত কয়েকবছর ধরে এই আইনে নাগরিকদের গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ তুলে ধারাটি বাতিলের অভিযোগ করে আসছিলেন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার-কর্মীরা।

সরকারও ধারাটি বাতিল করে সাইবার অপরাধ দমনে নতুন একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের কথা বলেছিল।

কিন্তু গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাসের পর দেখা যাচ্ছে সেখানে ৪টি ধারায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিতর্কিত ৫৭ ধারাটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

এমনকি নতুন এই আইনে জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার আরও বেশি খর্ব হবে বলেও আশংকা করছেন অনেকে।

সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আসলে কি বলা আছে? আর এটা নিয়ে এতো উদ্বেগই বা কেন?

বাংলাদেশে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন ‘এডিটরস কাউন্সিল’ এর সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম মনে করেন, এই আইনের ফলে গণমাধ্যম-কর্মীদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে।বাংলাদেশে ২০১৩ সালে আইসিটি আইনে ৫৭ ধারা যুক্ত হওয়ার পর গত কয়েকবছর ধরে এই আইনে নাগরিকদের গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ তুলে ধারাটি বাতিলের অভিযোগ করে আসছিলেন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার-কর্মীরা।

তিনি বলছিলেন, ‘আইনের ৩২ ধারায় বলা আছে ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গ করা হলে ১৪ বছরের সাজা। এখন সরকারি গোপনীয়তা কী? যে কোন জিনিষ যেটা সরকার অফিসিয়ালি জনগণকে জানাচ্ছে না, সেটাই তো সিক্রেট থেকে যাচ্ছে। এই আইন অনুযায়ী সেটা তো জনগণের জানার অধিকার নেই। কারণ সরকার সেটা জানাচ্ছে না। কিন্তু সাংবাদিকদের তো সেটা জানাই ২৪ ঘণ্টার কাজ। এটা তো স্টেট সিক্রেট হওয়ার ফলে আমি তো আর এখানে সাংবাদিকতা করতে পারবো না।’

তার মতে, পরোয়ানা ছাড়াই আইনের ৪৩ ধারায় তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তাতেও চাপের মুখে পড়বেন গণমাধ্যম-কর্মীরা।

‘৪৩ ধারা অনুযায়ী, কোন পুলিশ অফিসার যদি আমার মিডিয়া অফিসে এসে তল্লাশি করেন এবং মনে করেন যে তদন্তের স্বার্থে আমার অফিসিয়াল সার্ভারে তার ঢোকা দরকার এবং তিনি যদি সার্ভার জব্দ করেন, তাহলে অপরাধের আলামত থাকুক আর না থাকুক সার্ভার জব্দ হওয়ায় আমার ঐদিনের প্রকাশনা তো বন্ধ রাখতে হবে।’

‘এটা কয়েকদিনও বন্ধ থাকতে পারে। এমনকি সরকার কোন খবরের কাগজ বন্ধ করার আদেশ না দিয়েও কাগজটা বন্ধ করে দিতে পারেন শুধু সার্ভারটা যদি উনারা কব্জা করে নেন’, বলছিলেন মাহফুজ আনাম।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৫৩ ধারায় বলা আছে আইনের ১৪টি ধারা থাকবে অ-জামিনযোগ্য।

এক্ষেত্রে মানবাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মত মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুলতানা কামাল।

তিনি বলছিলেন, ‘আইনে ১৪ টি ধারা অ-জামিনযোগ্য করা হয়েছে। এসব ধারায় কাউকে গ্রেফতার করলে তার আর জামিন হবে না। এবং তার অপরাধ প্রমাণ হতে হতে হয়তো বেশ কিছুদিন চলে যাবে। ততদিন তাকে গ্রেফতার থাকতে হবে। শুধু সন্দেহের উপরে যখন তখন যে বাহিনীর যেটা কাজ না তাকে দিয়ে এরকম কাজ করা যায় না।’

গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার কর্মীদের আরেকটা বড় উদ্বেগ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফলে যেটা বাতিল হয়ে গেছে।

কিন্তু বাতিল হওয়া ৫৭ ধারাটি কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন তারা।

নতুন আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, কারো মানহানি কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মতো বিষয়গুলোকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেগুলোর শাস্তি ক্ষেত্র বিশেষে তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড।

কিন্তু সুলতানা কামাল মনে করেন, এই ধারাগুলোতে অপরাধগুলো সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না হওয়ায় এসবের অপব্যবহারের যথেষ্ট সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।

তবে দেশে সাইবার অপরাধ দমনে যে সুস্পষ্ট আইন থাকা দরকার সে বিষয়ে অবশ্য ভিন্নমত নেই কারো।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলছিলেন, ‘সাইবার অপরাধীদের জন্য আইন থাকবে। এতে আমরা আপত্তি তুলতে পারি না। কিন্তু এ আইনে যখন গণমাধ্যমকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, তখন তো সাংবাদিকরা জেল-জরিমানার খড়গ নিয়ে কাজ করতে পারবেন না।’

আনাম বলছিলেন, আইনটি সংসদে তোলার আগে এ সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সঙ্গে সম্পাদকদের যে বৈঠক হয়েছিলো সেখানে তারা সাইবার অপরাধ ও গণমাধ্যমকে একাকার না করার জন্য কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন।

কিন্তু সেগুলো আমলে নেয়া হয়নি।

‘কমিটিতে আমাদের মূল বক্তব্য ছিল যে, আপনারা এই ধারাতে একটা প্রভিশন আনেন যে এই আইন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। যদি সেটা করতে না পারেন তাহলে এমনটা করেন যে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে যখনি এ আইনের কোন প্রয়োগ আসবে সেটা যেন প্রেস কাউন্সিল হয়ে আসে। কিন্তু এগুলো মানা হয়নি।’

তবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইমরান আহমদ দিচ্ছেন ভিন্ন যুক্তি।

‘উনারা অনেক প্রস্তাবই দিয়েছিলেন, আমরা সেগুলো বিবেচনা করে দেখেছি। ডিজিটাল মাধ্যমে যখন কোনো একটা অপরাধ হয়, সেখানে তো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে সেটা দমন করা যাবে না। আমরা তো প্রেস কাউন্সিলের জন্য অপেক্ষা করতে পারি না। এখানে আসল কথা হচ্ছে সবাই যদি সতর্ক থাকেন, বেআইনি কিছু না করেন, তাহলে তো কারো বিরুদ্ধে কিছু হবে না।’

আহমদ বলছেন, এই আইনে অযথা কারো হয়রানি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর যে অপব্যবহার হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে?

 

creativesoftbd.com

     আজকের খবর বিডি কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  

জরুরি সেবা ফোন নাম্বার