June 24, 2021, 12:00 am

creativesoftbd.com

সুদহার কমেনি, কমেছে ঋণ

ঘোষিত সিঙ্গেল ডিজিটে সুদহার না নামিয়ে উল্টো ঋণ বিতরণ কমিয়ে দিয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। শুধু এক মাসের ব্যবধানে ঋণ কমেছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, কোনো কোনো ব্যাংক ৯ শতাংশ হারে আমানত সংগ্রহ করে ঋণ দিচ্ছে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেষমেশ তাদের আশঙ্কাই সত্যি হল। তারা বলেছিলেন, ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর কথা বলে ব্যাংক মালিকরা শুধু সরকারের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা নেবেন; কিন্তু বাস্তবে তারা সেটি বাস্তবায়ন করবেন না। বরং বেশি চাপাচাপি করলে কৌশলে ঋণ দেয়া কমিয়ে দেবেন। এখন সেটিই ঘটছে। আর এ পথ বেছে নিয়ে প্রকারান্তরে তারা প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। এটাকে প্রতারণা বললেও ভুল বলা হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতের ওপর ভর করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এখন সেই বেসরকারি খাতে ঋণ কমাটা অর্থনীতির জন্য খুব নেতিবাচক। এতে কর্মসংস্থান কমবে, অর্থনীতির অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক এমডি যুগান্তরকে বলেন, ‘এটি রাজনৈতিক ঘোষণা ছিল। তাদের স্বার্থ হাসিল হয়েছে। ফলে এখন তারা এটি বাস্তবায়ন করবে না।’

এদিকে যেসব ব্যাংকের চেয়ারম্যান স্বতঃপ্রণোদিত বা আদিষ্ট হয়ে আমানতে ৬% এবং ঋণে ৯% সুদহার ঘোষণা করেছিলেন, তাদের কেউ কেউ নিজেদের ঘোষণা নিজেরাই লঙ্ঘন করেছেন। একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান সে সময় বলেছিলেন, ‘আজকের এ ঘোষণা যেন কথার কথা না হয়, অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।’ অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকটি এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানত (এফডিআর) সংগ্রহ করছে ৯ শতাংশ সুদে আর ৬ মাস মেয়াদি এফডিআর সংগ্রহ করছে সাড়ে ৮ শতাংশ সুদে।

ওই ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ৯ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে ১২-১৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। তা না হলে লোকসান হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি যুগান্তরকে বলেন, সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দিতে গেলে ব্যাংককে লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তাই তারা ঋণের প্রবণতা কিছুটা কমিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ে বেশি সময় দিতে চান। এ ছাড়া তারা শিল্পঋণের চেয়ে ভোক্তাঋণে বেশি আগ্রহী কারণ এ শ্রেণীর ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটের আওতামুক্ত।

সূত্র জানায়, গত জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ এক হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। আগের মাস জুন শেষে মোট ঋণ ছিল ৯ লাখ ৭ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। এতে আগের মাসের তুলনায় ঋণস্থিতি কমেছে ৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, শতকরা হিসাবে যা শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ। ব্যাংক খাতে তারল্যের টানাটানি, নির্বাচনের আগে নতুন বিনিয়োগে ব্যাংক ও গ্রাহকদের বাড়তি সতর্কতাসহ বিভিন্ন কারণে ঋণস্থিতি কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন-অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, তিন কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ কমেছে। নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে ঋণ বিতরণে একটু ধীরগতি দেখা দেয়। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী বছরের মার্চের মধ্যে ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) কমিয়ে ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর ৮৯ শতাংশে নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এ ছাড়া আমানতে ৬ শতাংশ এবং ঋণে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের একটা প্রভাবও আছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ ধীর করে দিয়েছে। তবে এ সময়ে কোনো ব্যবসায়ী ঋণ না পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে না বলে দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগের মাসের তুলনায় ঋণস্থিতি কমলেও গত জুলাই পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।

এর আগের মুদ্রানীতিতে একই রকম প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হলেও গত জুনে প্রবৃদ্ধি হয় ১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। গত এক বছরে কখনও বেসরকারি খাতের ঋণে ১৬ শতাংশের নিচে প্রবৃদ্ধি হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয় গত বছরের নভেম্বরে।

ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির পক্ষ থেকে জুলাই মাসে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ব্যাংক ৯ শতাংশের বেশি সুদে মেয়াদি আমানত নিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। পরে তা আবার ৯ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তা-ও এখন করছে না। কেউ বলছেন, লোকসান থেকে বাঁচতে অনেক ব্যাংক আপাতত নতুন করে আর ঋণ দিচ্ছে না।

এ ছাড়া নির্বাচনের আগে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাসহ সব শ্রেণীর ব্যক্তির মধ্যে ঋণ হিসাব স্বচ্ছ রাখার একটা প্রবণতা থাকে। এ রকম সময়ে ঋণ আদায় জোরদারে ব্যাংকগুলোও নানা পদক্ষেপ নেয়। সব মিলিয়ে ঋণস্থিতি কমেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় গত কয়েক বছর অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে প্রচুর অলস অর্থ ছিল। ঋণের সুদহার নেমে আসে এক অঙ্কে। অনেকদিন ধরে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ হচ্ছিল। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় নগদ টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়।

যদিও এ তথ্য নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, আমদানির নামে মূলধনী যন্ত্রপাতি আনতে যে পরিমাণ অর্থের এলসি খোলা হয়েছে তার বিপরীতে সে পরিমাণ যন্ত্রপাতি দেশে আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কিছু না আসারও অভিযোগ আছে। ফলে আমদানির আড়ালে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

আবার ফারমার্স ব্যাংক আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে না পারার খবরে আমানত সংগ্রহে হিমশিম খান উদ্যোক্তারা। আগ্রাসী বিনিয়োগ ঠেকাতে গত জানুয়ারিতে হঠাৎ করে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা কমিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এটিও বিরূপ প্রভাব ফেলে। এরপর সুদহার বেড়ে আবার দুই অঙ্কে উঠে যায়।

নির্বাচনের বছরে সুদহার কমাতে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হলেও কাজের কাজ না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিঙ্গেল ডিজিটের দিকনির্দেশনা দেন। এখন সে নির্দেশনাও উপেক্ষিত। অনেকে মনে করেন, এর পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র কাজ করছে। যে কারণে মহলবিশেষ এখানে বিনিয়োগের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে সবকিছুর লাগাম টেনে ধরে।

 

creativesoftbd.com

     আজকের খবর বিডি কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  

জরুরি সেবা ফোন নাম্বার